জাতীয়

বিচারহীনতায় বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন: চার মাসে শিকার ৭৭৬

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ই মে ২০২৬, ১৯:৫৩

বিচারহীনতায় বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন: চার মাসে শিকার ৭৭৬

দেশে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সামাজিক লজ্জা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি-এপ্রিল) ৭৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের দেওয়া তথ্যমতে, বছরের প্রথম চার মাসেই এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭৮ জন, যার একটি বড় অংশই কন্যাশিশু। এছাড়া দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬২ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ জন। হত্যার মতো চরম অপরাধের ঘটনা ঘটেছে ১৯১টি এবং রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ৭৩ জনের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই সংখ্যা কেবল ‘দৃশ্যমান অংশ’। প্রকৃত নির্যাতনের হার আরও বেশি। কারণ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক অপমান ও প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে মামলা করতে সাহস পায় না। অনেক ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নির্যাতনের মূল কারণ। অপরাধীরা জানে যে প্রভাব খাটিয়ে বা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে পার পাওয়া সম্ভব।”

২০২৫ সালে সারা দেশে ২,৮০৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই গত বছরের প্রায় ২৮ শতাংশ ঘটনা ঘটে গেছে। বিশেষ করে মার্চ (১৯০ জন) ও এপ্রিল (২২০ জন) মাসে সহিংসতার হার আগের চেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

সহিংসতার তালিকায় ধর্ষণ ও হত্যার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সাইবার অপরাধ, পাচার, অপহরণ ও যৌতুক প্রথা। গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত শিশুরাও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রাজধানীর এক গৃহকর্মী শিশুর ওপর নির্যাতনের পর মৃত্যুর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অধিকারকর্মীরা বলছেন, গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন না থাকায় এই খাতে নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা ও বিষণ্নতায় ভোগে, যা আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে তাদের প্ররোচিত করে। এই সংকট উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, থানাগুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীল ডেস্ক কার্যকর করা এবং সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও সক্রিয় করার দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।

শুধু আইন করে নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি শিশুও নিরাপদ না থাকা মানে রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যর্থতা, তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

সব খবর