নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ই জুন ২০২৬, ১৬:২৪
ফিফা বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী মঞ্চে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা, সগর্বে উঁকি দিচ্ছে সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার আর জাতীয় ফুল শাপলা—কয়েক বছর আগেও এই দৃশ্য কল্পনা করা যেকোনো বাংলাদেশির জন্য ছিল এক অসম্ভব স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই অসম্ভবই বাস্তবে রূপ নিল। কানাডার টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গায়ক, সংগীত পরিচালক ও ডিজে সঞ্জয় দেবের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে রচিত হলো বাংলাদেশের এক নতুন ইতিহাস। সঞ্জয় শুধু তাঁর সুরের জাদুতেই বিশ্বকে মাতাননি, বরং নিজের পোশাকের মাধ্যমে কোটি বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন শতকোটি দর্শকের সামনে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বসেছে এবারের ফুটবলের মহোৎসব। ১১ জুন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর, ১২ জুন কানাডা অঞ্চলের বিশেষ আয়োজনে মঞ্চ মাতান সঞ্জয় দেব। ফিফার উদ্যোগে নির্মিত বিশ্বকাপের নতুন গান ‘সির সির’ (Sir Sir) পরিবেশন করেন তিনি। এই পরিবেশনায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন বিশ্বখ্যাত কানাডীয় নৃত্যশিল্পী ও মডেল নোরা ফাতেহি এবং ফরাসি হিপহপ তারকা ভেজেড্রিম। ত্রয়ীর এই বৈশ্বিক পারফরম্যান্স স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শককে যেমন নাচিয়েছে, তেমনি টেলিভিশনের পর্দায় থাকা ফুটবলপ্রেমীদের মাঝেও উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়।
গানের সুর ও তালের মোহময় আবেশের মাঝেই বাংলাদেশের দর্শকদের চোখ আটকে যায় সঞ্জয় দেবের পরনের বিশেষ জ্যাকেটটিতে। পারফরম্যান্সের একপর্যায়ে সঞ্জয় বারবার তাঁর জ্যাকেটের হাতার (স্লিভ) দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। নিপুণ কারুকাজে সেই হাতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের গৌরব ও ঐতিহ্যের প্রতীকগুলো। সেখানে ছিল সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ক্ষিপ্র রূপ, জাতীয় ফুল শাপলার শুভ্রতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার লাল-সবুজের অনুষঙ্গ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে দাঁড়িয়ে সঞ্জয়ের এই ইঙ্গিত যেন পুরো পৃথিবীকে বলছিল, ‘এটাই আমার বাংলাদেশ, এটাই আমার পরিচয়।’ এই বিশেষ পোশাকটির পেছনে কাজ করেছেন একঝাঁক আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইনার। পোশাকটির মূল নকশা করেছেন ছায়া কুমার, নিখুঁত এমব্রয়ডারির কাজটি করেছেন জন কিম এবং পুরো লুকটির স্টাইলিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন জেসমিন প্যাটেল।
সঞ্জয় দেবের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াই ও সাধনার গল্প। তাঁর শিকড় বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে। বাবা সন্তোষ দেব ও মা মিতা দেবের সাথে প্রায় দুই দশক আগে, শৈশবেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। প্রবাসের মাটিতে বেড়ে উঠলেও নিজের সংস্কৃতি ও সুরের টানকে তিনি কখনো ভুলে যাননি। সেখানে কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিভার জোরে সংগীতজগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। আর সেই দীর্ঘ সাধনার চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি জায়গা করে নেন ফিফা বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে।
"আমি বিশ্বকাপের এই মুহূর্তের জন্য খুবই বিশেষ পরিকল্পনা করেছি। কারণ, এমন মুহূর্ত জীবনে বারবার আসে না।" — অনুষ্ঠানের আগে প্রথম আলোকে দেওয়া সঞ্জয় দেবের বক্তব্য
বিশ্বকাপের মঞ্চে পারফরম্যান্সের একটি মাত্র ৬৫ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ সঞ্জয় তাঁর ফেসবুক পেজে শেয়ার করার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিডিওটি ৬০ লাখের (৬ মিলিয়ন) বেশি ভিউ পার করে। লাখো মানুষের আবেগে সিক্ত এই পোস্টে রিঅ্যাকশন আসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ এবং শেয়ার হয় ১০ হাজারেরও বেশি।
বিনিয়োগ অঙ্গনের তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঞ্জয়কে অভিনন্দনে ভাসাচ্ছেন। সুদূর প্রবাসে বেড়ে উঠেও জন্মভূমিকে হৃদয়ে ধারণ করার এই অনন্য নজির আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বৈশ্বিক বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতি দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।