নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ই মে ২০২৬, ১৬:৩০
হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যুর দায়ে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহানের বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠছে দেশের সব পেশার মানুষ। সকল বাধা উপেক্ষা করে প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামছে সচেতন সমাজ। আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘প্রতিরোধযোগ্য হাম রোগে নিষ্পাপ সম্ভাবনাময় শিশু জত্যার জন্য দায়ি ইউনূস-নূরজাহান গংদের বিচার ও মৃত শিশুদের ক্ষতিপূরণের দাবি’ এবং জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে একটি মাববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ এর ব্যানারে আয়োজিত এই প্রতিবাদে অংশ নেয় শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এসময় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মৃত শিশুদেও মোটিফ নিয়ে প্রতিবাদ জানান সাধারণ মানুষ। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, ইউনূস সরকারের গাফিলতিতে আজ হাজারো শিশু মৃত্যুও মুখে। ইতোমধ্যে সরকারি হিসেবে ৫ শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যার বলি হয়েছে সাধারণ পরিবারের নিষ্পাপ শিশুরা। এজন্য ইউনূস সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিচার করতে হবে। এছাড়া দেশদ্রোহী ইউসূন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করে দেশের স্থায়ী ক্ষতি করেছে। এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান বক্তারা। এসময় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিরসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশাল মানববন্ধন থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে টিকা সংকটে মৃত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। ক্রিয়েটিভ রাইটার্স-এর মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালির সঞ্চালনায় মানববন্ধনের মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র পরিচালক, কলাম লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট কামরুজ্জামান সাগর।
মানববন্ধনে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সাকিল আহমদ (অরণ্য) বলেন, সরকারি গাফিলতির কারণে অকালে চলে গেছে শত শত শিশু। গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান আমাদের রক্তাক্ত করেছে। আজকে আমরা এখানে শুধু কান্না করতে আসিনি; আমরা এখানে এসেছি বিচার দাবি করতে। ৫ শতাধিক শিশুর মৃত্যু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি পরিকল্পিত এক মানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যকর টিকা ব্যবস্থা বাতিল করে ভ্যাকসিন ক্রয়নীতি হঠাৎ পরিবর্তন করা হয়। এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। আমরা জানতে পেরেছি, ইউনিসেফ বারবার নুরজাহান বেগমকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবাণী উপেক্ষা করা হয়। প্রশ্ন রাখছি, ড. ইউনূস সাহেব, যিনি সারা বিশ্বে উন্নয়নের পুরস্কার পেয়েছেন, তিনি কিভাবে বাংলাদেশের শিশুদের রক্তের দায় এড়িয়ে চলতে পারেন? বিচারহীন এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি আর নয়।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে সাকিল আহমদ (অরণ্য) বলেন, একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি হুমকির মুখে ফেলে একটি 'পারস্পরিক চুক্তি' (জবপরঢ়ৎড়পধষ ঞৎধফব অমৎববসবহঃ) স্বাক্ষর করেছে, যা আসলে এক ধরনের অর্থনৈতিক আত্মসমর্পণ। এই চুক্তি অনুযায়ী সয়াবিন, ভুট্টা এবং মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হবে, যা দেশের কৃষকদের ধ্বংসের মুখে ফেলবে।
অ্যাডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তী বলেন, আমি চাই ইউনূস, তার বান্ধব নুরজাহান এবং তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। এরা দেশটাকে লুট করেছে। এরা যেন কোনভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার বলেন, ড. ইউনূস মেটিকুলাস ডিজাইনে ২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশটাকে নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে। বাঙালি বুঝতে পেরেছে ইউনূসের কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। এছাড়া হামের কারণে যত শিশু মারা গেছেন সবকিছুর জন্য ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান দায়ি। তাদের বিচার করতে হবে। সাংবাদিক হাসান আহমেদ সংহতি প্রকাশ করে অবিলম্বে হামের জবাবদিহিতা ও মার্কিন ঔপনিবেশিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন নাট্যজন এহসানুল আজিজ বাবু, সাংবাদিক সোহেলী চৌধুরী, শান্তা ফারজানা, মোমিন মেহেদি, অভিনেতা রূপক দেহলভি, ফারহানা আফরোজ রুনা, রাজিব হাসান এবং সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম মাসুম প্রমূখ।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন শাহজাহানপুরের দিনজমজুর মোক্তার হোসেন। তিনি কেনো এসছেন, জানতে চাইলে বলেন, আমি আমার এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলাম। এখানে প্রতিবাদ দেখে দাঁড়ালাম। ইউনূস দেশটাকে ধ্বংষ করেছে। আমারা জীবনে হামে মৃত্যুও কথা শুনিনি। এখন মহামারির মতো বাড়ছে। আমার ভাতিজা হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। টিকা কিনলো না কোনো? এর জবাব ইউনূসকে দিতেই হবে। তার মতো আরও অনেক সাধারণ মানুষ এই মানবনন্ধনে জড়ো হয়েছিল। সবার চোখে মুখে চিন্তার ভাজ, যেনো নিজের শিশু আক্রান্ত হয়েছে। তারা প্রতিবাদি কন্ঠে টিকা সংকট সৃষ্টিতে জড়িতদের বিচার চেয়েছেন।
মাববন্ধন থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে
১. টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও হামে শিশু মৃত্যুর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা। ২. জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করা। ৩. জুলাই ২০২৪-এর কোটা আন্দোলনের হত্যাকা-ের জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার। ৪. আগুন সন্ত্রাস,ভাঙচুর, লুটপাট ও মব কালচারের সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা। ৫. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আটক সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি। ৬. সকল রাজনৈতিক দলের অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকা-ের অধিকার নিশ্চিত করা। ৭. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। ৮. তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার। ৯. আইসিটি আদালতে রাজনৈতিক হয়রানি ও প্রহসনমূলক বিচার বন্ধ করা। ১০. সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত কর।
সমাপনী বার্তায় বক্তারা হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি অনতিবিলম্বে এই ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামীতে সারাদেশে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধ শেষে একটি প্রতিবাদি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘আমার শিশু মরলো কেনো, ইউনূস তুই জবাব দে’ ‘মার্কিণ গোলামী চুক্তি বাতিল করো, করতে হবে’ এমন বিভিন্ন সেøাগান দিয়ে বিচার দাবি করা হয়।