নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৫ই জুন ২০২৬, ২২:২৮
কমছে না হামের প্রকোপ, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সংশয়
দেশব্যাপী হামের প্রকোপ রুখতে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ শতভাগ পূরণ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ভ্যাকসিন দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও প্রতিদিন হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিনের মান, কার্যকারিতা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পাঠানোর সময় সঠিক কোল্ড চেইন (তাপমাত্রা) বজায় রাখা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং পরবর্তীতে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের নিয়ে গণ-টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। চূড়ান্ত হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ শতাংশ বেশি টিকা কাভারেজ সম্পন্ন হওয়ার দাবি করে স্বাস্থ্য বিভাগ। সাধারণত টিকা প্রয়োগের ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সংক্রমণের হার আগের মতোই ঊর্ধ্বমুখী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই শতভাগ সাফল্যের কাগজ-কলমের হিসাবের সাথে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, "কোনো এলাকায় ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও, বাস্তবে বাকি ১ হাজার শিশু বাদ পড়েছে। ফলে সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হচ্ছে না এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে না।"
একই সাথে ভ্যাকসিনের গুণগত মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, এবারের ক্যাম্পেইনে ব্যবহৃত টিকাগুলো গত সেপ্টেম্বর থেকে ইপিআই-তে মজুত ছিল। সেখান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের টিকাদান কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোল্ড চেইন বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নির্ধারিত তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি তাপের সংস্পর্শে এলেই এই টিকার কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "টিকা দিলেই যে কাজ হবে, এমন নয়। শিশুদের শরীরে আদৌ কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা বয়সভিত্তিক রক্তের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। আমরা বারবার বলার পরও সরকার এ বিষয়ে এক ধরণের গা-ছাড়াভাব দেখাচ্ছে।"
ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ স্বীকার করেন যে, বিষয়টি এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। তবে তিনি এটি মহাপরিচালককে (ডিজি) জানাবেন বলে আশ্বাস দেন। হামের প্রকোপ কবে কমবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "এটা বলা সম্ভব নয়, সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে।"
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের প্রকোপ এখন আশঙ্কাজনক। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে সর্বমোট ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৯ হাজার ৫০৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশজুড়ে মোট ৬১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই মারা গেছে ৫ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের প্রকৃত কাভারেজ যাচাই না করলে এই মহামারি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।