অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ২২:০০
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে গত শুক্রবার সই করেছে। এর আগে গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে একই ধরনের একটি চুক্তি হয়েছিল।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত নতুন এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তি বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের সূচনা করতে পারে, যা ইসরায়েল ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থান নেবে এবং উভয় দেশকেই সতর্ক দৃষ্টিতে দেখবে।
আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চাইলেও তিন দেশের কেউই চুক্তিটিকে সরাসরি প্রতিরোধমূলক জোট হিসেবে উপস্থাপন করতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উসকে না দেওয়ার বিষয়ে তিন দেশই সতর্ক।
তবে চুক্তিটি স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের কতটা বাধ্যতামূলকভাবে সামরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল জাজিরাকে বলেন, আমরা এখনো মক্কা ঘোষণাটি দেখিনি।
আমরা মনে করি, এতে বলা হয়েছে, একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে এখানে ‘বিবেচনা করা উচিত’ কথাটিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর অর্থ এই নয় যে (অন্যদের) অবশ্যই যুদ্ধে নামতে হবে।
হুমকিগুলোও কাল্পনিক নয়। ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িত। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষ হয়েছিল।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব বারবার ইরান ও দেশটির মিত্রদের হামলার মুখে পড়েছে।
তুরস্কও বহু বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনাও বেড়েছে।
উলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি তিন দেশকে এসব সংঘাতে কীভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তা এখনো অনিশ্চিত।
‘ধরুন, ইয়েমেনে হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাল। তাহলে কি তুরস্কও যুদ্ধে জড়াবে? পাকিস্তান কি জড়াবে? সেটিই এখনো দেখার বিষয়,’ বলেন উলম্যান।
বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের উত্তেজনাও শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার অবসান এখনো হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যসহ আশপাশের দেশগুলো এখন এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় এবং ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
অনেক দেশই পারস্পরিক হুমকির মুখে পুরোনো মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে বাস্তববাদী নীতিকে সামনে রাখছে।
তুরস্ক ও সৌদি আরব এর ভালো উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে গভীর সংকট তৈরি হয়েছিল, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়।
তবে ২০২২ সালের মধ্যে রিয়াদ ও আঙ্কারা অতীতের বিরোধ পাশে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সৌদি আরব তখন পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর কৌশল নিয়েছিল, আর তুরস্ক অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী ছিল।
এরপর থেকে ইসরায়েল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়েছে এবং অঞ্চলটির জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশকে আরও কাছাকাছি আসতে উৎসাহিত করেছে।
প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো তিন দেশের সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
আল জাজিরার সংবাদদাতা ওসামাহ বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশই এই জোটে ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশই অনন্য সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সামরিক বাহিনী, বিপুল গোলাবারুদ এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশের মধ্যে এটিই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার।’
‘তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও উন্নত প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। আর সৌদি আরব দিচ্ছে এর আর্থিক শক্তি,’ বলেন ওসামাহ বিন জাভিদ।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার নিরাপত্তা-নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নতুন সামরিক জোট ও নতুন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। সৌদি আরব এবং কিছুটা কম মাত্রায় তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার ইসরায়েল। ফলে অন্যান্য মিত্রের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটন কতটা এগিয়ে আসবে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উলম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, মিত্রদের নিজেদেরই নিজেদের রক্ষা করতে হবে। আমার কাছে এটা স্পষ্ট যে আমাদের মিত্ররা অন্যত্র তাকাচ্ছে।’
ইসরায়েল ও ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখা হলেও মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারী দেশ কোনোভাবেই এই জোটকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত জোট হিসেবে উপস্থাপন করছে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল ও ইরানের হুমকি স্পষ্ট।
বিন জাভিদ বলেন, ‘তিন দেশের কাছেই ইসরায়েল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এই হুমকির তালিকায় ইরানও খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে তেহরানের হামলার পর সৌদি আরবের জন্য।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের দৃষ্টিতে, ইসরায়েল ২০২৩ সালের পর থেকে প্রমাণ করেছে যে তারা আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে বেশি আগ্রহী। অথচ একসময় ইসরায়েলই সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি একটি সম্ভাব্য ‘সুন্নি অক্ষ’ গড়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তিনি এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য উল্টো সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিগুলোকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক, এই তিন দেশেই সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
ইরান এরই মধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীও দেশটিতে হামলা করেছে। এর জবাবে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে ইরাকে হামলা চালিয়েছে।
নতুন সদস্য যুক্ত হবে?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ভবিষ্যতে মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আরও দেশ যুক্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ধরনের জোটের সুবিধা অবশ্যই রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত ছিল। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এই বিভক্তিই ইসরায়েল ও ইরানের মতো হুমকি মোকাবিলায় তাদের অক্ষমতার অন্যতম কারণ।
তবে অতীতের বিভাজন এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের কারণে জোটটি সম্প্রসারিত হবে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সিরিয়া এখন ১৩ বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে অবস্থানের কারণে দেশটি এমন কোনো চুক্তিতে যোগ দিতে দ্বিধায় পড়তে পারে, যা ইসরায়েল নেতিবাচকভাবে দেখবে।
মিসরও অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী। অতীতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়েও মিসর দ্বিধায় ছিল। কারণ, এতে দেশটি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটের সম্ভাব্য সদস্য হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আবুধাবির অবস্থান এই তিন দেশের থেকে বারবার আলাদা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ও মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি করেছে, যা ইসরায়েলের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ। ফলে এটি মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী একটি জোট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সম্পর্কের এই বাস্তবতা শুক্রবারের প্রতিরক্ষা চুক্তির পর নতুন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, এমন সরল ধারণার পথে বড় বাধা।
এই অঞ্চলে গত কয়েক দশক ধরেই জোট ও মিত্রতার সমীকরণ বদলেছে। ভবিষ্যতেও তা বদলাতে পারে।
এই জোটের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যাবে যখন এটি বাস্তব কোনো সংকটের মুখোমুখি হবে। ইসরায়েল ও ইরান দেখিয়েছে, তারা যুদ্ধে যেতে এবং এর পরিণতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি একে অপরের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা তাদের সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে। আর তখন নেওয়া সিদ্ধান্তই পরিষ্কার করে দেবে, সত্যিই কি মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় কোনো আঞ্চলিক অক্ষের উত্থান ঘটছে।