নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৬ই জুন ২০২৬, ২০:১৭
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসা এই খাতটিতে গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় রফতানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস এবং ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে, যেখানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় অংশ রফতানি হয়।
ইউরোপে কমছে চাহিদা, রফতানিতে বড় পতন
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রফতানি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, যা মোট আরএমজি রফতানির ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।
তবে এই বাজারে রফতানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমানোর প্রবণতার কারণে পোশাক বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
রফতানিকারকদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতারা কম পরিমাণে অর্ডার দিচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দাম কমানোর চাপও দিচ্ছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও স্থবিরতা
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। আলোচ্য সময়ে দেশটিতে ৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা মোট রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ।
তবে এই বাজারেও কার্যত স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। আগের বছরের তুলনায় রফতানি আয় শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ কমেছে। সংখ্যাটি ছোট মনে হলেও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে প্রবৃদ্ধি না থাকা নিজেই একটি সতর্ক সংকেত।
তাদের মতে, মার্কিন ভোক্তারা এখনও ব্যয় কমানোর নীতি অনুসরণ করছেন। ফলে বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মজুত ব্যবস্থাপনা আরও সতর্কভাবে পরিচালনা করছে এবং নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার আগে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
‘পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হয়নি বৈশ্বিক বাজার’
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের রফতানি চিত্র থেকে স্পষ্ট যে বৈশ্বিক বাজারে এখনও চাহিদার পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তারা এখনও ব্যয় সংকোচনের মধ্যে রয়েছেন, যার প্রভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন এবং অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বেশি সতর্ক। ফলে রফতানি আয় ও মুনাফা– দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারে নেতিবাচক বা স্থবির প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনক। একইসঙ্গে অপ্রচলিত বাজারেও প্রায় ৬ শতাংশ রফতানি কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এখন প্রায় সব বাজারেই ছড়িয়ে পড়েছে।
অপ্রচলিত বাজারও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি
গত কয়েক বছর ধরে রফতানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে এসব বাজার থেকেও আশানুরূপ ফল আসেনি। অপ্রচলিত বাজারে মোট রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির ১৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। এ বাজারে রফতানি আয় কমেছে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, সংকট শুধু ইউরোপ ও আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থর গতি বিশ্বের প্রায় সব বাজারেই প্রভাব ফেলছে।
কানাডায় কিছুটা স্বস্তি, যুক্তরাজ্যেও চাপ
প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে কানাডায়। দেশটিতে রফতানি হয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে রফতানি হয়েছে ৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। তবে সেখানে রফতানি আয় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। যদিও পতনের হার তুলনামূলক কম, তবুও এটি বাজারটির দুর্বল চাহিদার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিট ও ওভেন– দুই খাতেই মন্দা
পণ্যের ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণেও ইতিবাচক কোনও চিত্র নেই। নিটওয়্যার খাতে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অর্থাৎ টি-শার্ট, পোলো শার্ট, সোয়েটার থেকে শুরু করে শার্ট, ট্রাউজার ও জ্যাকেট– সব ধরনের পোশাকের ক্ষেত্রেই চাহিদা কমার প্রভাব পড়েছে।
সামনে আরও কঠিন সময়?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অর্ডার কমে যাওয়াই নয়, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, মজুরি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তবে আশার কথা হলো, বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি দেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতারই প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজার বহুমুখীকরণ এবং নতুন ক্রেতা আকর্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।
তবে আপাতত যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, আর সেই ধাক্কাই রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হিসেবে ফুটে উঠছে।