নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ই জুন ২০২৬, ১৯:৩৪
দেশে প্রথম ২০০০ সালে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে বিগত ২৬-২৭ বছর ধরে এই রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ কেবল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই গত নয় বছরে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবুও দৃশ্যমান কোনো সুফল মিলছে না; বরং প্রতি বছরই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ২০২৩ সালে রেকর্ড ১,৭০৫ জনের মৃত্যুর পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমলেও ডেঙ্গুর স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা।
বিপুল অঙ্কের এই বাজেট ও ব্যয়ের পরও ডেঙ্গু কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের আলোচনায় মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নাগরিক উদাসীনতার এক বহুমাত্রিক সংকট ফুটে উঠেছে।
ভৌগোলিক বৈষম্য ও ঘরের ভেতরের চ্যালেঞ্জ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীনের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে দুটি বড় 'গ্যাপ' বা ঘাটতি রয়েছে। প্রথমত, ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম মূলত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন কেবল রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশেপাশে ওষুধ ছিটCodeাতে পারে, কিন্তু ঘরের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না; অথচ এডিস মশা ও লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভেতরেই।
সনাতন পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাব
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমনের মতে, আমাদের মশা নিধন পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ ও সনাতন। মশার সুনির্দিষ্ট জোন বা 'হটস্পট'গুলো চিহ্নিত না করে বর্তমানে গণহারে যেকোনো জায়গায় ওষুধ স্প্রে করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা কোনো কাজে আসছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। আগে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও এখন দীর্ঘায়িত বর্ষা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে সারা বছরই এর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে; আগে এটি শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাত, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ ডেঙ্গু ভাইরাসের জেনোমিক গঠনে বা মশার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে দেশে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার চরম ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসায় গাইডলাইন অবহেলা ও ওষুধের অপপ্রয়োগ
'বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিন'-এ প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণাপত্রে চিকিৎসা খাতের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে:
গাইডলাইন অবহেলা: হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে মাত্র ৩৫.১% রোগী জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) চিকিৎসা পেয়েছেন এবং ৪৭.৯% রোগী সঠিক গাইডলাইন পাননি।
ওষুধের অপপ্রয়োগ: চিকিৎসায় কোনো প্রয়োজন বা পরামর্শ ছাড়াই ৩৩.৩% ক্ষেত্রে অন্যান্য ওষুধ, ২৮% ক্ষেত্রে স্টেরয়েড এবং ৩৯.৮% ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের মারাত্মক অপপ্রয়োগ দেখা গেছে।
পর্যবেক্ষণের অভাব: মাত্র ১২.৮% রোগীর ক্ষেত্রে গাইডলাইন অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ করা হয়েছিল।
এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতাও একটি বড় কারণ। যিনি ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার ট্রেনিং পাচ্ছেন, তাকে অন্যত্র বদলি করা হচ্ছে এবং নতুন ও অপ্রশিক্ষিত জনবলকে দেওয়া হচ্ছে রোগীর দায়িত্ব। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ স্যালাইন বা ফ্লুইড মজুত আছে, তার সঠিক তথ্যও সময়মতো পাওয়া যায় না।
নাগরিক উদাসীনতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর একক কোনো সংস্থার দায়িত্বের বিষয় নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি নাগরিকদের আচরণগত সমস্যা ও উদাসীনতা মশার বংশবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিজেদের ঘরবাড়ি, ছাদ, গ্যারেজ বা এসি-ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করার মানসিকতা কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, ডেঙ্গুর কোনো কার্যকর গণ-টিকা না থাকায় প্রতিরোধই একমাত্র পথ। সরকার ও জনগণকে যৌথভাবে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে এবং তিন দিনের বেশি কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বর্তমানে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই ডেঙ্গু সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।