নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ১৯:৫৬
কার্লো আনচেলত্তিকে ব্রাজিলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সবাই সাদরে গ্রহণ করেনি। পাঁচবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগেই শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল এই কোচের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না।
আপত্তির মূল কারণ ছিল অন্য জায়গায়।
ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি স্থায়ী কোচ হিসেবে আনচেলত্তির নিয়োগ অনেকের কাছে দেশের ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বরাবরই বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের পাশাপাশি সফল কোচও তৈরি করেছে। সেই ঐতিহ্য থেকে সরে এসে বিদেশির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া অনেক ব্রাজিলিয়ানের কাছে সহজে মেনে নেওয়ার মতো ছিল না।
উরুগুয়ে ও ইংল্যান্ডের পর বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই তৃতীয়, যারা বিদেশি কোচের ওপর ভরসা করেছে। তাই উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে পারলেই কেবল এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ হবে বলে মনে করেন অনেক সমর্থক।
তবে আনচেলত্তির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তার দলকে এমনভাবে জেতানো, যা ঐতিহ্যগত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে আনচেলত্তির দায়িত্ব শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকায় ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের দীর্ঘসূত্রতায় বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের অভিযান ছিল বেশ অস্থির। গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পরিবর্তন এনেছেন, তবে তা বিপ্লবাত্মক নয়; ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগোচ্ছে দল।
কেন ব্রাজিলকে শিরোপার প্রধান দাবিদার মনে হচ্ছে না
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের দল অপরাজিত থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে উঠলেও শুরু থেকেই তারা খুব একটা দাপুটে ফুটবল খেলতে পারেনি।
উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের প্রথমার্ধে ব্রাজিল ছিল নিষ্প্রভ। এরপর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেও শেষ ষোলোতে জাপানের বিপক্ষে আবারও একই দুর্বলতা দেখা যায়। এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর অবশ্য কাসেমিরো ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় তারা।
দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে মাঝমাঠের অ্যাথলেটিক সক্ষমতার ঘাটতি। মরক্কো ও জাপান দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণের সামনে ব্রাজিলের মিডফিল্ডকে অসহায় দেখিয়েছে। তারা প্রতিপক্ষের গতি ও শক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেয়েছে।
তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিবারই ম্যাচে ফেরার পথ খুঁজে পেয়েছে ব্রাজিল, যার বড় কৃতিত্ব আনচেলত্তির ম্যাচ চলাকালীন কৌশলগত পরিবর্তনের।
জাপানকে হারানোর পর তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বিষয়গুলোতেই মনোযোগ দিয়েছি, যেগুলো আমাদের খেলায় বাধা সৃষ্টি করতে পারত। মানসিক চাপ ও কষ্ট আধুনিক ফুটবলের স্বাভাবিক অংশ।’
এটাই আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি সমস্যাকে অস্বীকার করেন না; বরং দুর্বলতাগুলো মেনে নিয়ে সেগুলোর সমাধান খোঁজেন। তাই কঠিন মুহূর্তে খেলোয়াড়দের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বেঞ্চে এমন একজন কোচ আছেন, যিনি জানেন কীভাবে ম্যাচ এবং শিরোপা জিততে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুরুতে গোল হজম করলে ব্রাজিল প্রায়ই ছন্দ হারিয়ে ফেলত। জাপান ম্যাচের আগে ২০২৩ সালের পর প্রথমে গোল খাওয়ার পর মাত্র একবার জয় পেয়েছিল সেলেসাওরা। তাই জাপানের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পাওয়ার মানসিক গুরুত্বও ছিল অনেক।
কেন আনচেলত্তিই হতে পারেন সমাধান?
জাতীয় দলের মতো পরিবেশে আনচেলত্তির শান্ত স্বভাব এবং খেলোয়াড়দের প্রতি আস্থাশীল মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাব ফুটবলের তুলনায় জাতীয় দলে কৌশলগত অনুশীলনের সুযোগ কম থাকে। ফলে খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা এবং দলকে একসূত্রে গেঁথে রাখার দক্ষতা এখানে বেশি প্রয়োজন, আর এই জায়গাতেই আনচেলত্তি অসাধারণ।
তবে শুধু মানসিক শক্তি দিয়েই সব দুর্বলতা ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। ২০০২ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ জিততে চাইলে ম্যাচের শুরু থেকেই আরও ধারাবাহিক হতে হবে ব্রাজিলকে। রক্ষণে দুর্বলতা কমাতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বাস্তববাদী ফুটবলও খেলতে হবে।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ব্রাজিল ঠিক এই বাস্তববাদী ফুটবল খেলেই শিরোপা জিতেছিল। ২০০২ সালেও সেই বাস্তববাদের ছাপ ছিল। যদিও সেই দলগুলোকে পেলের ‘জোগো বনিতো’ যুগ কিংবা ১৯৮২ সালের দৃষ্টিনন্দন কিন্তু শিরোপাবঞ্চিত দলের মতো সমান মর্যাদা দেওয়া হয়নি। কারণ অনেকের চোখে সেই সাফল্য ছিল ‘অতি রক্ষণাত্মক’ এবং ‘অব্রাজিলীয়’।
আনচেলত্তির অধীনে এবার হয়তো সেই বাস্তববাদকেই আরও সহজভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ব্রাজিলিয়ানরা। বিদেশি কোচকে যখন মেনে নিয়েছে, তখন ভিন্ন ধরনের ফুটবলও হয়তো তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আনচেলত্তি জনমত নিজের পক্ষে আনতে পেরেছেন। রিও ডি জেনেইরোতে বসবাসের সিদ্ধান্ত কিংবা নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে রেখে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ সমর্থকদের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব খেলোয়াড় এবং সমর্থক উভয়ের মন জয় করতে শুরু করেছে। এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, এই ব্রাজিলকে সত্যিকারের বিশ্বকাপের শিরোপাপ্রত্যাশী দলে পরিণত করা।