নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ২০:১০
নিরাপত্তাজনিত কারণ ও বিগত বছরের সহিংস পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে চলতি বছরের ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির তালিকা থেকে গোপালগঞ্জ জেলাকে বাদ দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবসে’ গোপালগঞ্জে দলটির কেন্দ্রীয় কোনো নেতা যাবেন না। তবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বিকল্প হিসেবে ওই দিন স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উদ্যোগে কেবল দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ শীর্ষক মাসব্যাপী কর্মসূচির পথনকশা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আগামীকাল সোমবার থেকে এই পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আকস্মিক পরিবর্তন
শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের যে আনুষ্ঠানিক রুট বা সূচি দেওয়া হয়েছিল, তাতে ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে পদযাত্রার কথা উল্লেখ ছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এর ঠিক ঘণ্টাখানিকের মাথায় দলটির পক্ষ থেকে একটি সংশোধিত তালিকা গণমাধ্যমে পাঠানো হয়, যেখানে দেখা যায় গোপালগঞ্জের কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। আকস্মিক এই পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী গুঞ্জন শুরু হলেও এনসিপি প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আজ রোববার বিকেলে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম গণমাধ্যমকে জানান, আগামী ১৬ই জুলাই রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মসূচিতে দলের শীর্ষ নেতারা ব্যস্ত থাকবেন। এর পাশাপাশি গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে যে চরম অপ্রীতিকর ও সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেটির পুনরাবৃত্তি এড়াতে নিরাপত্তার বিষয়টি এবার বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বিগত বছরের সহিংসতা ও ১৪৪ ধারা
গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে এনসিপি নেতারা দেশব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সে সময় দলটির পক্ষ থেকে ফেসবুকে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ স্লোগানে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। এর জের ধরে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে এনসিপি সমর্থকদের সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সেই রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় চারজন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন জেলাজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়।
উত্তেজনাপূর্ণ ওই পরিস্থিতিতে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ শীর্ষ নেতাদের জেলা পুলিশ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে হয়েছিল। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া যানে (এপিসি) করে নেতাদের গোপালগঞ্জ ত্যাগ করার ছবি ও ভিডিও সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
"বিগত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করেই এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি গোপালগঞ্জের মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকছে।" — এনসিপি দলীয় সূত্র
ভিন্ন আঙ্গিকে স্থানীয় কর্মসূচি
সারজিস আলম স্পষ্ট করেছেন যে, কেন্দ্রীয় নেতারা না গেলেও গোপালগঞ্জকে একেবারে কর্মসূচিহীন রাখা হচ্ছে না। তিনি বলেন, “গোপালগঞ্জে পদযাত্রার পরিবর্তে আমাদের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা নির্দিষ্ট দিনে সাংগঠনিক আলোচনা ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করবেন। এটি মূলত শহীদদের স্মরণে একটি অভ্যন্তরীণ ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হবে, যেখানে ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন না।”
আগামী সেপ্টেম্বরে গোপালগঞ্জ সফরের সম্ভাবনা
চলতি জুলাই মাসে পদযাত্রা স্থগিত করলেও এনসিপি নেতারা জানিয়েছেন, গোপালগঞ্জ জেলাকে তাঁদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে রাখা হচ্ছে না। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’-এর সদস্য সারোয়ার তুষার জানান, এনসিপি ইতিমধ্যে দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে গোপালগঞ্জের একটি পৌরসভাও রয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার অংশ হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আমরা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ওই এলাকাগুলোতে যাব। তখন গোপালগঞ্জে আমাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।” রাজনৈতিক পর্ষদের আরেক সদস্য আলী আহসান জুনায়েদও নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে খুব দ্রুতই এনসিপি পূর্ণ শক্তি নিয়ে গোপালগঞ্জে রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করবে।