নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭শে জুলাই ২০২৬, ২০:২৮
রাজধানী ঢাকা জুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। সিএনজি পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত চাপ বা প্রেশার না থাকায় রাস্তায় হু হু করে কমে গেছে গ্যাসে চালিত বাস, সিএনজি অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক প্রাইভেট কারের সংখ্যা। চরম যানবাহন সংকটে পড়ে প্রতিদিনের গন্তব্যে পৌঁছাতে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নগরবাসী। এই সুযোগে অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং গাড়িতে ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিকল্প হিসেবে যাত্রীরা মেট্রোরেলমুখী হওয়ায় সেখানেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বিমানবন্দর সড়ক, বনশ্রী ও মিরপুরসহ প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে গণপরিবহনের এই সংকটের সার্বিক চিত্র চোখে পড়েছে।
সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর রামপুরা সেতু সংলগ্ন বনশ্রী-ডেমরা সড়কে গিয়ে দেখা যায় গন্তব্যমুখী মানুষের দীর্ঘ সারি। এই রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনের কর্মচারীরা জানান, ডিজেলচালিত বাসগুলো নিয়মিত চললেও গ্যাসে চালিত বাসগুলো পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে সময়মতো ট্রিপে আসতে পারছে না। সারারাত জেগে পাম্পে বসে থেকে সকালে মাত্র একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, তাদের রুটে থাকা বাসগুলোর প্রায় অর্ধেকই চলে গ্যাসে। পাম্পে প্রেশার না থাকায় বাসের বড় একটি অংশ অলস বসে থাকছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নেওয়া চালক ও হেলপারদের জন্য চরম বিরক্তি ও কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারারাত না ঘুমিয়ে সকালে একটি ট্রিপ দেওয়ার পর দ্বিতীয়বার গ্যাস নেওয়ার জায়গা বা সময় থাকছে না।
একই অবস্থা দেখা গেছে গুলশান-মিরপুর, গাবতলী, সায়দাবাদ, শাহবাগ ও বিমানবন্দর রুটেও। বাসের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় সচল বাসগুলোতে উঠতে চরম হুড়োহুড়ি ও ঠেলাঠেলির শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বড় ধকল গেছে গ্যাসে চালিত সিএনজি অটোরিকশার ওপর। পাম্পে ৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস পাওয়ায় একটু চালানোর পরেই অটোরিকশার ইন্ডিকেটরে লাল বাতি জ্বলে উঠছে। অথচ সারাদিন গাড়ি চলুক বা না চলুক, চালকদের পকেট থেকে দৈনিক ১২০০ টাকার মতো মালিকের জমা ঠিকই গুণতে হচ্ছে।
চালকরা বলছেন, গাড়ি না চললে মহাজনের জমা দেবো কীভাবে আর পরিবারকেই বা খাওয়াবো কীভাবে? এদিকে রাজধানীতে নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশার অর্ধেকেরও বেশি এখন গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে। যা দু-একটি চলছে, চালকরা গ্যাসের অজুহাতে দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করছেন। বনশ্রী থেকে গুলশান-১ বা বিমানবন্দরের নিয়মিত ভাড়া যেখানে স্বাভাবিক ছিল, বর্তমানে তা দ্বিগুণেরও বেশি দাবি করা হচ্ছে।
ভাড়ায় ও চুক্তিভিত্তিক গাড়ি নিয়ে রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে গাড়ি চালানো চালকরা পড়েছেন চরম আর্থিক বিপাকে। উবার ও পাঠাওয়ের নিবন্ধিত গাড়িগুলোর সিংহভাগই গ্যাসনির্ভর। তেলে চালিয়ে রাইড দিলে লোকসান নিশ্চিত জেনেই তারা বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন।
চালকদের মতে, মালিককে প্রতি মাসে চুক্তি অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। এর জন্য মাসে অন্তত ৫০ হাজার টাকার ওপর ট্রিপ মারতে হয়। তেলে গাড়ি চালালে নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে, আর পাম্পে দাঁড়ালে দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে।
সড়কে বাস, অটোরিকশা ও অ্যাপভিত্তিক গাড়ির চরম সংকট থাকায় যেসব যাত্রী আগে সিএনজি বা উবারে যাতায়াত করতেন, তারা বাধ্য হয়ে এখন মেট্রোরেলমুখী হচ্ছেন। এতে করে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মেট্রোরেল স্টেশনগুলো এবং ট্রেনের ভেতরে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হচ্ছে। অনেক যাত্রী ভোগান্তি এড়াতে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন।
নগরবাসীরা বলছেন, সিএনজি পাম্পগুলোতে সংকট স্থায়ী রূপ নেওয়ায় গোটা রাজধানীর সার্বিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা দিকনির্দেশনা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাসহ পাম্পগুলোতে স্বাভাবিক প্রেশার ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।