নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭শে জুলাই ২০২৬, ২০:৩৩
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) রোববারের একটি ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নেতা ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ তিনজনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। তবে হামলায় ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর, রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এই উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
শিক্ষার্থীরা জানান, রোববারের একটি ঘটনার ধারাবাহিকতায় সোমবার এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রী একই বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন। ওই রাতেই প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে অভিযুক্তের পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সোমবার দুপুরে এ বিষয়ে পুনরায় বৈঠক ডাকা হলে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারসহ অন্য নেতারা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযুক্ত করেন। এ সময় তার মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কিছু ছবি পাওয়ার দাবি করা হয়। এরপর প্রক্টর দপ্তরে আনাসকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে প্রক্টর পরিস্থিতি শান্ত করলে সবাই সেখান থেকে চলে যান।
প্রক্টর দপ্তরের ঘটনার কিছুক্ষণ পর বিকেল তিনটার দিকে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী রাকসু ভবনে যান। সেখানে হাতাহাতির একপর্যায়ে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব আহত হন বলে রাকসুর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এর পরপরই উভয় পক্ষ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রক্টর কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তার জন্য গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে নিয়ে যান। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই রাকসু জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাসহ কয়েকজন নেতা পাঠকক্ষে প্রবেশ করে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে মারধর করেন। এ সময় পাঠকক্ষে উপস্থিত অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাধা দিতে গেলে তারাও হামলার শিকার হন। গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাকে আবারও মারধরের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার সময় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে থাকা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, “আমরা পড়াশোনা করছিলাম। হঠাৎ একদল লোক রিডিং রুমে ঢুকে যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ বলে অভিযুক্ত করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা হয়েছে। কেউ অপরাধী হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”
হামলার শিকার শিক্ষার্থী আনাস দাবি করেন, তিনি ছাত্রলীগের কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। অতীতে চেনা-পরিচিত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি কখনো সংগঠনের কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি। অথচ তাকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে ছাত্রশিবির সরাসরি জড়িত নয়। তবে রাকসু নেতাদের ওপর হামলার খবর পেয়ে তারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
অন্যদিকে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, “রাকসু ভবনে এসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের নেতাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। প্রশাসনের কাছে তাদের বিচারের দাবি জানানোর পর এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, “দিনব্যাপী ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা পুলিশ প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে বৈঠক করছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”