জাতীয়

যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা করতে গিয়ে হাত হারানো আল আমিন এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’!

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ২১:৩০

যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা করতে গিয়ে হাত হারানো আল আমিন এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’!

ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানা তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা আল-আমিনের হাত কাটা যাওয়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হওয়ার দাবি করলেও, আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। প্রশ্ন উঠেছে তার সরকারি গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও।


ময়মনসিংহ শহরের সানকিপাড়া শেষমোড় এলাকার বাসিন্দা আল-আমিন (৩৮) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অঙ্গসংগঠন তাঁতি দলের কোতোয়ালী থানা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


গত বছরের ১৬ অক্টোবর কোতোয়ালী থানায় করা একটি মামলায় আল-আমিন উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে তার ওপর হামলা হয়। তিনি দাবি করেন, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কমিশনার রোমানের অফিসের সামনে পৌঁছানোর পর স্লিপ খেয়ে পড়ে গেলে তাকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয় এবং তার ডান হাতের কবজি কেটে ফেলা হয়।


তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই শহরের বিজয় মিছিল শেষ হয়ে যায়। এরপর রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের কলপা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। আল-আমিন তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে সেই গ্রামে হামলা চালাতে গিয়েছিলেন।


ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক ছাত্রনেতা জানান, এলাকার যুবলীগ নেতা ও তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমানের ভাইদের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল। সেই আক্রোশ থেকেই বিজয়ের রাতে তারা ওই এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর করতে যান। এ সময় গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে ধাওয়া করলে পালানোর সময় পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে যান আল-আমিন। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনি ও কোপে তার ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মাথায় গুরুতর জখম হয়।


এদিকে আল-আমিন দাবি করেছেন, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তার বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে এবং তার চিকিৎসা সরকারিভাবে ভ্যারিফাইড হয়েছে। রাজনৈতিক হামলায় আহতদেরও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।


তবে সরকারের ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী—‘জুলাই যোদ্ধা’ অর্থ কেবল তারাই, যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের আক্রমণে আহত হয়েছেন। আল-আমিনের এই ঘটনার সঙ্গে এই সংজ্ঞার মিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ময়মনসিংহের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক গকুল সূত্রধর মানিক জানিয়েছেন, আন্দোলনের দিনগুলোতে আল-আমিনকে কখনও রাজপথে দেখা যায়নি। ১৯ জুলাই ছাত্রদল নেতা রেদোয়ান হোসেন সাগর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার সময়ও আল-আমিনের আহত হওয়ার কোনো তথ্য ছিল না। যদিও আল-আমিন ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে আন্দোলনের কিছু ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন করে নিজের সম্পৃক্ততা দাবি করেছেন।


একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতার প্রতিপক্ষ এলাকায় গিয়ে হামলার সময় হাত হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুয়া গেজেট বা স্বীকৃতি পাওয়ার এই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও নেটিজেনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।