নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৪ঠা মে ২০২৬, ২২:৩২
রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর ও পীরগাছা এলাকার পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দাম মণপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা কমে গেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম দাঁড়াচ্ছে ৬-৭ টাকা। অথচ কৃষকদের তথ্যমতে, প্রতি মণ আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। বাজারে আলু বিক্রি করে খরচের অর্ধেক টাকাও ফিরে আসছে না।
গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক পারভিন আক্তার নিজের গরু বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে ৫০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "জমি লিজ নিয়ে, সার-কীটনাশক বাকিতে কিনে চাষ করেছি। এখন পাইকার পাচ্ছি না, ঘরে রাখা আলুতেও পচন ধরেছে। ঋণ শোধ করব কীভাবে?"
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বিভাগে উৎপাদিত প্রায় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টনের বিপরীতে হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ১১ লাখ টনের কিছু বেশি। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। হিমাগারে জায়গা না পেয়ে এবং দাম বাড়ার আশায় কৃষকরা বাড়িতে আলু স্তূপ করে রাখেন। কিন্তু বর্তমান আবহাওয়া ও আর্দ্রতার কারণে সেই আলুতে দ্রুত পচন ও পোকা ধরতে শুরু করেছে। লালমনিরহাটের কৃষক মাহমুদুল হাসান জানান, ঘরে রাখা আলু আর ১৫-২০ দিনের বেশি রাখা সম্ভব নয়। উপায় না পেয়ে অনেক কৃষক বস্তা বস্তা পচা আলু রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন।
একসময় রংপুর থেকে বিপুল পরিমাণ আলু বিদেশে রপ্তানি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২১-২২ সালে প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হলেও এ বছর এখন পর্যন্ত মাত্র ১২৬ টন রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে, হিমাগার মালিকরাও চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। উত্তমাশা কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী ওবায়দুল বুলু জানান, গত বছর দাম না থাকায় অনেক কৃষক ১০ হাজার বস্তা আলু হিমাগার থেকে বেরই করেননি। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিক খরচ মেলাতে গিয়ে হিমাগার মালিকদেরও বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিএডিসির (বীজ বিপণন) উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু চাষ করায় এই বিপত্তি। তবে কৃষকরা বলছেন অন্য কথা। তাদের দাবি, সরকার যদি দ্রুত সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ না করে এবং রপ্তানির বাজার উন্মুক্ত না করে, তবে সামনের বছরগুলোতে তারা আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
রংপুরের কৃষকদের এখন একটাই দাবি—সরকার আলুর একটি সর্বজনীন দাম নির্ধারণ করে দিক এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করুক। অন্যথায়, আলুর এই ‘বাম্পার ফলন’ কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়েই থাকবে।