নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০শে জুন ২০২৬, ১৮:৪৭
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে। রাজনৈতিক সরকার বদলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছে নতুন মুখ, বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে নানা প্রণোদনা ও সংস্কার কর্মসূচি। কিন্তু তারপরও পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরছে না। সূচক স্থবির, লেনদেন কম, নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই, আর পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো আস্থাহীন।
একসময় ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, শেয়ারবাজার কারসাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কেন শেয়ারবাজার চাঙ্গা হচ্ছে না?
১৬ বছরে হারিয়েছে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী
পুঁজিবাজারের সংকট বোঝার সবচেয়ে বড় সূচক হলো বিনিয়োগকারীর সংখ্যা।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখে। অর্থাৎ গত ১৬ বছরে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে গেছেন।
একই সময়ে বাজার মূলধন, লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামার ফল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতার প্রতিফলন।
আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট তারল্যের অভাব নয়, আস্থার অভাব।
২০১০ সালের ধসের পর একাধিকবার বাজার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে টাস্কফোর্স, তদন্ত কমিটি, নীতিগত সহায়তা এবং বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ মনে করেন, বাজার এখনো পুরোপুরি নিরাপদ হয়নি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈমের ভাষায়, শেয়ার কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়াই আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ। বাজারে বারবার কারসাজির অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি।
নতুন কোম্পানি নেই, বাজারে নেই গভীরতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মানসম্মত নতুন কোম্পানির অভাব।
গত দুই বছরে কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য নতুন কোম্পানি বাজারে আসেনি। ২০২৫ সালে একটি নতুন আইপিওও অনুমোদিত হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি পুঁজিবাজার তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেখানে নিয়মিত নতুন ও বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এখনো বাজারের বাইরে।
ফলে একই সীমিত সংখ্যক শেয়ারকে ঘিরেই লেনদেন আবর্তিত হচ্ছে। এতে বাজারে গভীরতা তৈরি হচ্ছে না এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও কারসাজির সুযোগ বাড়ছে।
৬২ কোম্পানির সতর্ক তালিকা বাজারে নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ৬২টি কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে।
এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ এবং ৩০টি কোম্পানি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’-এর মুখে রয়েছে।
এরও আগে ডিএসই ৪২টি কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তালিকায় কিছু নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া ও কার্যক্রম চালু থাকা কোম্পানির নামও থাকায় বাজারে বিতর্ক তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে যখন একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকেই বাজার থেকে দূরে সরে যান।
ব্যাংকের বিকল্প হতে পারেনি পুঁজিবাজার
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে শিল্পায়নের বড় অংশের অর্থায়ন হয় পুঁজিবাজারের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো শিল্প খাত মূলত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে হলে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখনো পুঁজিবাজারকে মূলধন সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখছেন না। নীতিমালার ঘনঘন পরিবর্তন, তালিকাভুক্তির জটিলতা এবং বাজারের অস্থিরতা তাদের নিরুৎসাহিত করছে।
বাজেটের ঘোষণা কি যথেষ্ট?
চলতি বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য একগুচ্ছ সংস্কার উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে— সমন্বিত ডিজিটাল তথ্য প্ল্যাটফর্ম; টি+০ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা; বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্রুত প্রত্যাবাসনের সুযোগ; বন্ড ও সুকুক বাজার সম্প্রসারণ; পৌর বন্ড চালু; দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়নে নতুন উপকরণ ব্যবহার।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
কারণ বাজারের সমস্যা এখন কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত বিশ্বাসের সংকট। বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান ঘোষণাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না এবং কারসাজিকারীরা সত্যিই শাস্তি পাচ্ছে কি না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে কঠিন পরীক্ষা
সম্প্রতি বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়েল-টাইম নজরদারি, কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর তদারকির ঘোষণা দিয়েছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশনের জন্য এটি বড় পরীক্ষা।
কারণ অতীতেও অনেকবার সংস্কারের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু বাস্তব ফলাফল খুব বেশি দেখা যায়নি। এবার বিনিয়োগকারীরা কথার চেয়ে কাজ দেখতে চান।
কী করলে ঘুরে দাঁড়াবে বাজার?
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি— শেয়ার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি; বড় ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনা; রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানের আইপিও; নীতিমালার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বৃদ্ধি; পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল; গুজব ও কারসাজি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজারের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও হবে না।
সরকার পরিবর্তন, নতুন কমিশন কিংবা বাজেট ঘোষণার চেয়েও বড় বিষয় হলো—বিনিয়োগকারীরা বাজারকে কতটা বিশ্বাস করছেন।
যতদিন পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারী মনে করবেন যে বাজারে কারসাজি করে পার পাওয়া যায়, দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত থেকে যাচ্ছে এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নেই, ততদিন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে স্থায়ী গতি ফিরবে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য। তাই শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করা শুধু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই কারণেই পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানো এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।