রুমা রহমান
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ১৯:৪৩
দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সনাতন ও তাত্ত্বিক শিক্ষা পদ্ধতির খোলস থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাকরির বাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে প্রচলিত বর্ষভিত্তিক পরীক্ষার পরিবর্তে সেমিস্টার পদ্ধতি প্রবর্তন, আধুনিক সিলেবাস সংস্কার, আউটকাম-বেইসড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম বাস্তবায়ন এবং একগুচ্ছ প্রায়োগিক ট্রেড কোর্স চালু করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর বরাত দিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বছরে দুটি সেমিস্টার চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় অনার্সে আটটি, মাস্টার্সে চারটি এবং বিএ পাস কোর্সে ছয়টি সেমিস্টার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বিপুল পরিমাণ প্রশ্নপত্র ছাপানোর ক্ষেত্রে সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসের বর্তমান সক্ষমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেমিস্টার পদ্ধতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে এক থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। সংকট নিরসনে তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ভবন ও সেকশন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যার চুক্তি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
এ দিকে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়াতে অনার্স ও পাস কোর্সে ‘একগুচ্ছ ট্রেড কোর্স’ বা কোর্সের একটি বাস্কেট উপহার দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সব বিভাগের জন্য ইংরেজি ও আইসিটি বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নতুন কাঠামোতে একাধিক আধুনিক কোর্স যুক্ত করা হবে, যার মধ্যে অন্তত একটি ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে। এই বাস্কেটে থাকবে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডাটা সায়েন্স, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এবং কেয়ার-গিভারের মতো সময়োপযোগী ও চাহিদাসম্পন্ন বিষয়।
এখানেই শেষ নয়, যারা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে মেকানিক্যাল, ফ্রিজ-এসি মেরামত বা কম্পিউটারের বেসিক ও অ্যাসেম্বলিংয়ের মতো কারিগরি কাজ শিখতে চায়, তাদের জন্য টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল কোর্স চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট বোর্ড, কলেজ এবং এনএসডির (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) সঙ্গে আলোচনা চলছে। এমনকি দুবাই, সৌদি আরব, আমেরিকা, কানাডা বা জাপানের মতো দেশে গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শিক্ষার বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হবে। এসব কোর্স সরাসরি কলেজে নাকি অন্য কোনো সার্টিফাইড প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে বর্তমানে সমীক্ষা চলছে।
একই সঙ্গে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে বিদ্যমান সিলেবাসে। আধুনিকায়নের এই কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দুই ধাপে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপাচার্য দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সিলেবাসে পড়াশোনা করে যারা ২০২৭ ও ২০২৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করবে, তারা প্রত্যেকেই এক একজন দক্ষ পেশাদার হিসেবে তৈরি হবে। "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি কিছুই জানে না এবং কোনো দক্ষতা নেই"—এমন প্রচলিত দুর্নামের দিন এবার শেষ হতে চলেছে।
শিক্ষার গুণগত মান ও বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়টি জোর দিচ্ছে ‘আউটকাম-বেইসড এডুকেশন’ বা ওবিই কারিকুলামের ওপর। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি দিনব্যাপী কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন এই কারিকুলামের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকে কেবল মুখস্থনির্ভর না রেখে আনন্দময়, সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী করা হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটির সফল বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে এবং নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান অংশীজন হওয়ায় এই সংস্কার উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।