রুমা রহমান
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ২০:৩৭
জন্মদাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মাতা যেখানে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে নিজ হাতে আদরের একমাত্র সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করার এক লোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অল্প বয়সে একাধিকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ের জেরে সৃষ্ট পারিবারিক কলহের জেরে আরফান হোসেন নির্জনা (১৭) নামের এক দশম শ্রেণির ছাত্রীকে পিটিয়ে ও মাথায় কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছেন তার মা-বাবা। শুধু হত্যাই নয়, অপরাধ ঢাকতে নির্মমভাবে মেয়ের হাত-পা বেঁধে লাশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে আসেন তারা।
নিহত নির্জনা খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সীমা দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল। এই রোমাঞ্চকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। এ ঘটনায় ঘাতক মা সীমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত পিতা আকাশ পলাতক রয়েছেন, তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, গত ৮ জুলাই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে খুলনা সদর থানা এলাকার নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়ক থেকে একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে পুলিশ। বস্তাটি খুললে তার ভেতর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাতনামা কিশোরীর মরদেহ পাওয়া যায়। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
লাশের কোনো পরিচয় না পাওয়ায় খুলনা সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তে নামে পিবিআই ও সিআইডিসহ পুলিশের একাধিক বিশেষায়িত দল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রচার ও বিভিন্ন সূত্রের সহায়তায় তদন্ত শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এরপরই পুলিশ সোনাডাঙ্গার বসুপাড়া এলাকায় নির্জনার বাড়িতে অভিযান চালায়।
পুলিশ নিহতের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে প্রথম দিকে মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা অত্যন্ত চতুরতার সাথে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি মর্গে গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে কান্নাকাটি করে পুরো হত্যাকাণ্ডের দায় নির্জনার সাবেক স্বামীর ওপর চাপানোর নাটক সাজান। সীমা দাবি করেছিলেন, নির্জনা একটি চিঠি লিখে বাড়ি থেকে তার সাবেক স্বামী রনির সাথে পালিয়ে গিয়েছিল এবং রনিই তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে গেছে।
তবে পুলিশের নিবিড় ও কৌশলগত জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ভেঙে পড়েন সীমা। তিনি স্বীকার করেন যে, বহিরাগত কেউ নয়, তারা স্বামী-স্ত্রী মিলেই তাদের একমাত্র মেয়েকে হত্যা করেছেন। এরপর ১০ জুলাই সীমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নির্জনার ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম ও একাধিকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার কারণে পরিবারটিতে দীর্ঘদিন ধরে চরম অশান্তি ও কলহ চলছিল। নির্জনা যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত, তখনই সে প্রথমবার বাড়ি থেকে পালিয়ে এক বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করে। কিছুদিন পর সেখান থেকে ফিরে আসে। এরপর গত ২১ এপ্রিল পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রনি নামের এক যুবককে বিয়ে করে। ১৭ দিন পর তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
হত্যাকাণ্ডের দিন অর্থাৎ ৮ জুলাই সকালেও নির্জনা তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য জেদ ধরে বাড়ি থেকে বের হতে যায়। তখন তাকে বুঝিয়ে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু বিকেল গড়াতেই বিষয়টি নিয়ে মা ও মেয়ের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে রাগ সামলাতে না পেরে মা সীমা মেয়েকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকেন। চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন পিতা আকাশ। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ঘর থেকে একটি কাঠের বাটা (বাটাম) এনে নির্জনার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। কাঠের আঘাতটি নির্জনার মাথায় লাগার সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের মেঝেতে তার মৃত্যু হয়।
একমাত্র মেয়ের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘাতক পিতা-মাতা চরম অস্থির ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। লোকলজ্জা এবং আইনি শাস্তি থেকে বাঁচতে তারা দ্রুত লাশ গুম করার পরিকল্পনা করেন। ঘাতক স্বামী আকাশকে সরাসরি সহযোগিতা করেন মা সীমা। তারা দুজনে মিলে ঘরের ভেতরেই নির্জনার হাত-পা শক্ত করে বাঁধেন এবং একটি প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর লাশটি ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে দেন। এরপর রাতের আঁধারে সুযোগ বুঝে নিরালা আবাসিক এলাকার নির্জন সড়কে বস্তাবন্দি লাশটি ফেলে দিয়ে তারা দুজনই পালিয়ে যান। পুলিশ আরও জানিয়েছে যে, ঘাতক পিতা-মাতার মাদক সেবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একটি পরিবারে মা-বাবার হাতেই সন্তানের এমন নির্মম মৃত্যু দেশের সমাজ কাঠামোর চরম অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, "মানুষের ভেতরের সহনশীলতা ও নৈতিকতা আজ আশঙ্কাজনকভাবে লোপ পেয়েছে। সমাজে মাদকাসক্তি ও একক পরিবারের আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ায় ক্ষোভ ও নিষ্ঠুরতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। দশম শ্রেণির একটি মেয়ের অভিভাবকহীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া যেমন সামাজিক অধঃপতন, তেমনি বাবা-মা মাদকাসক্ত বা দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়লে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।"
খুলনা নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ এবং মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সন্তানের ভুলত্রুটি বা আচরণগত সমস্যা থাকলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনো সমাধান হতে পারে না। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আমাদের পারিবারিক বন্ধন কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়ানো এবং সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি।