সারাদেশ

বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃত্যু বেড়ে ৪৪, বিপন্ন ১০ লাখ মানুষ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ১৯:৫৯

বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃত্যু বেড়ে ৪৪, বিপন্ন ১০ লাখ মানুষ

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধসের পৃথক ঘটনায় সাতটি জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৭টি জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। এতে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।

বন্যা কবলিত জেলাগুলো হলো— চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এর মধ্যে পাহাড় ধস ও বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে; সেখানে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ২৩ জন মারা গেছেন এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়াল ধসে ১১ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণ জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-বান্দরবান যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে। কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যাকবলিত এবং ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এছাড়া খাগড়াছড়িতে ২৭ হাজার, মৌলভীবাজারে ৩৮ হাজার এবং হবিগঞ্জে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

হঠাৎ উপচে পড়া পানি ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে ঘরবাড়ি হারিয়ে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন হাজারো মানুষ। সরকার দুর্গতদের জন্য মোট ১,১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে ইতোমধ্যে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো নিজের জলমগ্ন ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেওয়া বিপন্ন মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি সাহায্য পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি মানবিক সহায়তা জোরদার করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৬৪টি জেলার অনুকূলে মোট ৬,৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দিয়েছে, যার মধ্যে দুর্গত এই ৭টি জেলায় বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রামে ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা এবং কক্সবাজারে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য তিন জেলায় (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) প্রতিটিতে ৪০০ মেট্রিক টন করে চাল ও ২০ লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ কর্মসূচি ও জরুরি সাড়াদান সমন্বয় অধিশাখার যুগ্মসচিব সেখ ফরিদ আহমেদ জানান, বন্যাক্রান্ত জেলাগুলোর স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এনজিও কর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের চাহিদামতো পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া আছে এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই দুর্যোগ উত্তরণের চেষ্টা চলছে। বর্তমানে বন্যাকবলিত এলাকার লাখ লাখ মানুষ পানি কমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

এ সম্পর্কিত আরো খবর


সব খবর