নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১১
বাস থেকে নেমে রিকশায় উঠেছেন। হঠাৎ মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারী ভ্যানিটি ব্যাগে দিলো টান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিকশা থেকে ছিটকে পড়লেন সড়কে। এতে কেউ হারাচ্ছেন টাকা, মোবাইল, মূল্যবান সামগ্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। কেউ গুরুতর আহত হচ্ছেন, আবার কারও জীবনেরই ইতি ঘটছে। রাজধানীতে ছিনতাই এখন শুধু সম্পদ হারানোর ভয় নয়, প্রাণহানিরও আতঙ্ক জেঁকে বসেছে জনমনে।
কিন্তু এই আতঙ্কের পুরো চিত্র নেই পুলিশের অপরাধের খাতায়। কারণ, ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায়ই যাচ্ছেন না। যারা যাচ্ছেন, তাদের কারও কারও অভিযোগ; ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে ‘হারানো’র সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বলে থানা-পুলিশ। কারণে অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রীও থানায় নথিভুক্ত হচ্ছে ‘হারানো’ সামগ্রী হিসেবে। ফলে মামলার সংখ্যার বাইরে থেকে যাচ্ছে ছিনতাইয়ের বড় একটি অংশ।
পুলিশ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করছে। কর্মকর্তাদের দাবি, ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অবশ্যই মামলা নেওয়া হয়। তবে মামলা-পরবর্তী আইনি ঝামেলা এড়াতে অনেক ভুক্তভোগী নিজেরাই মামলা করতে চান না।
সর্বশেষ ২৯ আগস্ট সকালে চোখের চিকিৎসা করানোর জন্য স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন প্রধান শিক্ষক রনজিনা পারভীন। বাস থেকে নেমে রিকশায় ফার্মগেটের দিকে যাওয়ার সময় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিনা। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিনার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। এর প্রায় পাঁচ মাস আগে রাজধানীর উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং গত জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম নামে আরেক নারী একইভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
মৃত্যু হলো, পুলিশ জানলো পরে
ঈদের ছুটি শেষে গত ৬ জুন মেয়ের সঙ্গে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরেছিলেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ইসলাম। ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছাতেই মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। রিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সোহেলি। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১১ জুন মারা যান তিনি।
কিন্তু প্রাণহানির মতো গুরুতর ছিনতাইয়ের ঘটনাটিও কয়েক দিন পর্যন্ত পুলিশের অপরাধের খাতায় ওঠেনি। সোহেলির মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময় পর্যন্ত ঘটনাটি পুলিশের কাছে ছিল অজানা। পরে ১৩ জুন মামলা হলে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে। এসব কারণেই ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৭টি। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জ ও ডিএমপি এলাকায় ৪৪৩টি। শুধু ডিএমপির ৫০ থানায় মামলা হয়েছে ১৮৯টি। বাস্তবে কত মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পুলিশের কাছে নেই।
অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, নথিতে ‘হারানো’
গত ১১ মে বিকালে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তার মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগসহ অন্যান্য জিনিস নিয়ে যায় তারা। পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ভুক্তভোগীর বাবা থানায় মামলা করতে গেলে ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর জিডি করতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ নোমান ছিদ্দিকের। গত ১৬ আগস্ট রাতে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। ছিনতাইকারীরা তার মুঠোফোন নিয়ে যায়, তিনি গুরুতর আহতও হন। ঘটনার পর রমনা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর জিডি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তার। জিডিতে ফোনটি ‘হারিয়ে গেছে’ বলে উল্লেখ করা হয়। অস্ত্রের মুখে একটি মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হলেও সেটি যদি ‘হারানো ফোন’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়, তাহলে ঘটনাটি আর ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না।
থানায় যাচ্ছেন না অনেকে
আবার ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন। গত জুনে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের মাথায় বেড়িবাঁধ এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন একটি অটোমোবাইল কোম্পানির কর্মী ইমতিয়াজ ও সাদমান। তাদের মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
সাদমান শুধু মোবাইলের জন্য জিডি করেন। ইমতিয়াজ সেটিও করেননি। তার মতে, মামলা বা জিডি করেও হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়, থানায় হয়রানির ভয় এবং মামলা-পরবর্তী দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমার থানা এলাকায় কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হলে তিনি মামলা করতে পারেন। মামলা করতে এসে জিডি নেওয়ার ঘটনা আমার থানায় নেই। তবে কেউ কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হলেও পুলিশকে জানান না।’
গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেন বলেন, ‘ছিনতাইয়ের শিকার হলে অবশ্যই মামলা হবে। ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে মামলা রেকর্ড করা হয়। তবে অনেকে মামলা-পরবর্তী আইনি ঝামেলার কারণে অভিযোগ দেন না।’
‘ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বার ভিক্টিমাইজড হচ্ছেন’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘থানায় গেলেই প্রতিটি ঘটনায় মামলা হবে, বিষয়টি এমন নয়। অপরাধের ধরন ও আইনি শ্রেণি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে গুরুতর ঘটনায় মামলা না নেওয়া, কিংবা মামলা করতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ উদ্বেগজনক।’
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ভুক্তভোগীকে সহায়তা করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সহায়তার পরিবর্তে মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে না। এতে একজন ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বারও ভিক্টিমাইজড হচ্ছেন।’
তার মতে, এর প্রভাব সরাসরি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় পড়ছে। কেউ থানায় গেলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঘটনাটি জিডি হিসেবে নথিভুক্ত হবে, নাকি মামলা হিসেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকও বলছেন, ভুক্তভোগীর প্রতিকার পাওয়ার পথ কঠিন হলে ছিনতাইকারীরা আরও উৎসাহিত হয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তারা গ্রেফতার হলেও কিছুদিন পর বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় টহল বাড়ানোর পাশাপাশি বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ‘ছিনতাইকারীরা সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থান বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে তুলনামূলক ফাঁকা সড়কগুলোতে তারা সুযোগ নিচ্ছে।’
তিনি জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে বর্তমানে ৮৯টি চেকপোস্ট কাজ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় তিন থেকে পাঁচটি নিয়মিত টহল দল রয়েছে। চেকপোস্ট ও টহল তদারকিতে সুপারভিশন টিমও কাজ করছে। ওসমান গণি বলেন, ‘এরপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ছিনতাইয়ের রহস্য উদঘাটন, আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ‘হারানো’র জিডি হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে অবশ্যই মামলা নেওয়া হচ্ছে। এমন কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, একই ছিনতাইকারীকে একাধিকবার গ্রেফতার করেও দীর্ঘদিন আটকে রাখা যাচ্ছে না। আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তারা বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশপ্রধানের ভাষ্য, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম, ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। রাজধানীর কোন এলাকায়, কোন সময়ে, কী কৌশলে এবং কত ছিনতাই হচ্ছে, সেই তথ্যই যদি পূর্ণাঙ্গভাবে অপরাধের খাতায় না ওঠে, তাহলে ৮৯টি চেকপোস্ট আর শতাধিক টহল দলের কার্যকারিতাই বা মাপা হবে কীভাবে? আর সরকারি পরিসংখ্যানে ছিনতাইয়ের পুরো চিত্র না এলে নগরবাসীর আতঙ্ক কমানোর বাস্তব কৌশলই বা তৈরি হবে কোন তথ্যের ভিত্তিতে?