অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩রা অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৫৮
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এখন কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই যুদ্ধের নেপথ্যে দানা বেঁধেছে আরেকটি লড়াই, যেখানে সামনে আসছে চীনের ভূমিকা।
দেশটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে না জড়ালেও ইরানের সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের কৌশল বাস্তবায়ন এবং এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পথকে জটিল করে তুলছে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত কি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি পরোক্ষ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে? তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে।
বরং ওয়াশিংটনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে ইরানকে ঘিরে সংঘাত দুই দেশের স্বার্থকে মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে আসছে।
বিশেষ করে জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য। এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান ও স্বার্থের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতে কোন দেশের প্রভাব কতটা থাকবে, তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তাই ইরান সংঘাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধ না হলেও, এটি দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জটিল করে তুলতে পারে।
চীন ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন
ইরানের যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। যুদ্ধ শুরুর আগে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ইরান থেকে আসত। সংঘাত শুরু হওয়ার পরও তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চীন তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চীনের কাছে তেল বিক্রি করে ইরান গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আয় করছে। এই বাণিজ্যে চীনের স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। এসব শোধনাগার দেশটির বড় রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানির তুলনায় পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর কম নির্ভরশীল। ফলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের তেল কেনা তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ।
তবে ইরানের সঙ্গে চীনের এই বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও ব্যবস্থা নিয়েছে। ইরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত চীনা কম্পানি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের ওপর ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে, এমন প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু নেটওয়ার্ককেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। ফলে ইরান-চীন সম্পর্ক এখন শুধু তেল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সম্পর্ককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বার্থের পার্থক্যও আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে একটি জটিল কৌশলগত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। ইরানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এক বিষয়। কিন্তু চীনের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নিলে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে। এতে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের কিছু সরবরাহকারী ইরানে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি পাঠিয়েছে। এসব পণ্য সাধারণ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন।
এছাড়া জর্ডানে মার্কিন সেনাদের একটি স্থাপনায় ইরানের হামলার আগে বা পরে ব্যবহৃত কিছু স্যাটেলাইট ছবি চীনা প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে চীন এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই অভিযোগকে তেমন গুরুত্ব দেননি। সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘাত না থাকলেও বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধে বাণিজ্যিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের পার্থক্য দিন দিন কমে আসছে। নেভিগেশন ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ছবি, যোগাযোগ সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রযুক্তি এখন সামরিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোনো দেশকে সরাসরি সেনা বা ক্ষেপণাস্ত্র না পাঠিয়েও সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে সহায়তা করা সম্ভব। এসব সরঞ্জাম যুদ্ধের সময় একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এ কারণেই ইরানের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের ওপর নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক কাজে সরবরাহ করা কিছু প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে চীন-ইরানের স্বার্থের মিল
চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল বন্ধ বা ব্যাহত করলে চীনের তেল সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চায়। চীনও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে উত্তেজনা ও সামরিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে এ বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থের কিছুটা মিল রয়েছে।
চীন ইরানের পতন চায় না। একইসঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হোক বা তেল সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিক, সেটিও বেইজিং চায় না। তবে চীন ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং চীনা কর্মকর্তারা বারবার সংযম ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইরানকে সমর্থন করলেও চীন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে তার জ্বালানি সরবরাহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে যুদ্ধ
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব দেশটির সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে চীন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ক চালু রাখছে। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা সীমিত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। দুই দেশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে চায়। তাই এই সংঘাত তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসছে। তবে ইরান যুদ্ধকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধ বলা ঠিক হবে না। দুই দেশ ইরানে একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করছে না। কিন্তু সংঘাতের কারণে দুই দেশের স্বার্থ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও আর্থিক প্রভাব কাজে লাগাচ্ছে, সেখানে চীন বাণিজ্য, তেল কেনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাকে বাণিজ্য ও প্রযুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাবে? এই সংঘাত ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দুই দেশের প্রভাব ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।