আন্তর্জাতিক

ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র: এক সপ্তাহে যুদ্ধের অবসানের আশা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৭ই মে ২০২৬, ১৯:১১

ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র: এক সপ্তাহে যুদ্ধের অবসানের আশা


দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও চরম উত্তেজনার পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধাবসানের একটি স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন তেহরানের টেবিলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সব পক্ষ একমত থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।

ট্রাম্পের আশাবাদ ও হুমকির দ্বিমুখী নীতি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপে পড়ে চুক্তিতে আসতে আগ্রহী। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ব্রেট বায়ারকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আলোচনা খুবই ভালো এগোচ্ছে। আমি সময়সীমা নিয়ে আশাবাদী, সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা একটি চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাব।” তবে আলোচনার সমান্তরালে নিজের চিরচেনা ‘আক্রমণাত্মক’ অবস্থানও বজায় রেখেছেন তিনি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করে বা চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে দেশটিতে আগের চেয়েও ভয়াবহ ও তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করবে মার্কিন বাহিনী।

তেহরানের সতর্ক প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, মার্কিন প্রস্তাবটি বর্তমানে তাদের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান শিগগিরই তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক বিভাজন দেখা দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এই প্রস্তাবকে ‘একতরফা দাবিনামা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে তা আদায়ের চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে আলাপকালে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনার প্রক্রিয়া চলাকালেই ইরানকে লক্ষ্য করে দুবার হামলা চালিয়েছে ওয়াশিংটন, যা পিঠে ছুরি মারার শামিল।

সমঝোতা স্মারকের সম্ভাব্য শর্তাবলি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খসড়া চুক্তিতে বেশ কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে: ১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: ইরানকে অন্তত ১২ থেকে ১৫ বছরের জন্য উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে হবে। মেয়াদ শেষে তারা কেবল ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারবে। ২. নিষেধাজ্ঞা ও অর্থ ছাড়: বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেওয়া হবে। ৩. তদারকি ও পরিদর্শন: ইরানকে জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শকদের (IAEA) জন্য সব স্থাপনা উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং আকস্মিক পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। ৪. তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণ: ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য দেশে (সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে) সরিয়ে নিতে রাজি হতে পারে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় যদিও ট্রাম্প এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তির আশা করছেন, তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অনেক বিশ্লেষকই সন্দিহান। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে থাকা মতভেদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর সমীকরণ এই চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ৫ মার্চ রিয়াদে ইরানের হামলার পর যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে বাঁচতে দুই দেশই এখন একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছে বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হলে তা হবে বর্তমান শতকের অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা।

সব খবর