নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৭ই মে ২০২৬, ১৯:৩১
বিনিয়োগের বিপরীতে অভাবনীয় সুফল গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবায় মাত্র ১ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মৃত্যু, রোগের প্রকোপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে ৪ থেকে ৬৮ মার্কিন ডলার পর্যন্ত সুফল পেতে পারে। ৪০টি দেশে পরিচালিত ৪৬টি প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং রোগ নজরদারিতে বিনিয়োগ করলে তা কতটা কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের শহরগুলোতে তাপপ্রবাহ সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ফলে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলারের সুফল মিলেছে। এমনকি জ্যামাইকা ও সেন্ট লুসিয়ার মতো দেশগুলোতে এই সুফলের পরিমাণ বিনিয়োগের চেয়ে শতগুণ বেশি।
২০৫০ সালের ভয়াবহ পূর্বাভাস প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি এখনই শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ুজনিত কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হতে পারে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি ছাড়িয়ে যেতে পারে ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল সংক্রামক রোগের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অল্প খরচেই ব্যাপক সুরক্ষা অনেকেই মনে করেন জলবায়ু মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তন আনা ব্যয়বহুল। তবে ডব্লিউআরআই-এর হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। আড়াই কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে পূর্ণাঙ্গ জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে প্রতি ব্যক্তির জন্য বছরে খরচ হবে মাত্র ৭২ সেন্ট (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০০ টাকারও কম)। এই সামান্য খরচে একটি সমন্বিত প্যাকেজ সরকার, হাসপাতাল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক বেশি সক্ষম করে তুলতে পারে।
সমন্বয় ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সত্ত্বেও বিশ্বের অর্ধেকেরও কম দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের রোগ নজরদারি ব্যবস্থায় জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে। ডব্লিউআরআই-এর প্রেসিডেন্ট অ্যানি দাসগুপ্তা বলেন, "স্বাস্থ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মানবিক দিক। এটি সবার ওপর প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও শিশুদের ওপর।" অন্যদিকে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রধান কেলেসতে সাউলো সতর্ক করেছেন যে, প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য হাতে থাকলেও কেবল পদক্ষেপ নেওয়ার অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই গবেষণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জলবায়ু ও স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সেন্ট্রাল ফর পার্টিসিপোটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা মনে করেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলার চেয়ে এখন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও কমিউনিটি প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
পরিশেষে, প্রতিবেদনটি বিশ্বনেতাদের প্রতি এক জরুরি আহ্বান: জলবায়ু সংকট মূলত একটি স্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে জলবায়ু-বান্ধব করে গড়ে তোলাই এখন টিকে থাকার একমাত্র পথ। অন্যথায়, প্রকৃতির রুদ্ররোষে মানবস্বাস্থ্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা কোনো অর্থ দিয়েই পূরণ করা সম্ভব হবে না।