অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২রা জুলাই ২০২৬, ১৯:৩১
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন তেহরানের সঙ্গে নতুন একটি ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
প্রথম আলোচনাগুলো ছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে, এরপর ওমান ও কাতার, তারপর ইরান ও সৌদি আরব এবং সবশেষে কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে—যার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের ধুলোবালি থিতিয়ে আসার পর আঞ্চলিক সহাবস্থান কেমন হবে তা নির্ধারণ করা।
এমন বিস্ময়কর কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল শুরু হয়েছে, আরও বৈঠকের প্রত্যাশা রয়েছে, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে নতুন এক স্বাভাবিক (নিউ নরমাল) সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ করছে।
হরমোজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত কীভাবে পরিচালিত হবে এবং নিরাপত্তার সম্ভাব্য ছাড়ের বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে কী ধরনের আর্থিক সুবিধা দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার চলমান আলোচনার পাশাপাশি (তবে আলাদাভাবে) ঘটছে, যার সময়সীমা আগস্টের শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং এটি এখন বহু বছর ধরে চলছে।
ধারণাটি এমন, কেবল ইরানের সঙ্গে নিজস্ব সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি আসলে নিজেদের চুক্তি নিজেরাই করে ফেলে তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আপাতত প্রকাশ্য বার্তাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সম্প্রতি আঞ্চলিক জোটের সাম্প্রতিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে ‘মুক্ত, নিঃশর্ত এবং অবাধ চলাচলের’ গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং ‘কোনো ধরনের টোল, ফি বা প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রচেষ্টাকে’ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন।
চ্যাথাম হাউসের আনিসেহ বাসিরি তাব্রিজি বলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি একটি রেড লাইন বা সীমা হতে যাচ্ছে।
উপসাগরীয় কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, তারা বিশ্বাস করেন ইরান তার চূড়ান্ত তুরুপের তাসটি ছেড়ে দেবে না এবং সম্ভাব্য ফলাফলের বিষয়ে তাদের বাস্তববাদী হতে হবে।
সংবাদ মাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, একটি সম্ভাব্য স্কিমের বিষয়ে আলোচনা চলছে যেখানে ‘সার্ভিস ফি’ বা সেবা ফি সংগ্রহ করা হবে, যার উদ্দেশ্য প্রণালীতে মাইন অপসারণ, পরিবেশগত অবক্ষয় হ্রাস, বন্দর চার্জ বা বীমা সংক্রান্ত খরচ মেটানো। তবে কোন সংস্থা এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে, কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করা হবে এবং চূড়ান্ত অর্থ কাদের কাছে পৌঁছাবে তা এখনো অস্পষ্ট।
ইরান ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে; তাদের নবগঠিত গালফ স্ট্রেইট অথরিটির মাধ্যমে জাহাজের জন্য ইরানি বীমা থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। এটি ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কার্যকর হওয়ার কথা, সময়ের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রেখেছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, ইরান এখন বুঝতে পেরেছে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র তাদের হাতে আছে— হরমুজ প্রণালী। এটি তারা যেকোনো সময় ব্যবহার করতে পারে, তাই এমন এক ধরনের ব্যবস্থা থাকবে যেখানে ইরানই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। এই প্রভাব বজায় রাখার জন্য তারা সব কিছুই করবে।
ফি বা চার্জের বিষয়টিকে যেভাবেই উপস্থাপন করা হোক না কেন, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, যিনি বারবার বলেছেন কোনো চার্জ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা করছেন এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যদিও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চুক্তি অনুযায়ী ট্রানজিট ফি নিষিদ্ধ হলেও ‘জাহাজকে দেওয়া নির্দিষ্ট সেবার’ জন্য চার্জ নেওয়া যেতে পারে।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে হয়তো খুব কম বিকল্পই আছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ, ইরান ও ওমান আটকা পড়া জাহাজগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য দুটি রুটে সম্মত হওয়ার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালীতে জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়েছিল।
ইরান জোর দিয়ে বলেছিল, নির্দিষ্ট রুটগুলোর জন্য একমাত্র কর্তৃপক্ষ তারাই এবং সতর্ক করে দিয়েছিল, ‘এই রুটগুলোর বাইরে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
পরদিন, একটি তাইওয়ানিজ শিপিং অপারেটর জানায়, তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে হামলার শিকার হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন এটি একটি ইরানি ড্রোন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটিই ছিল প্রথম হামলা।
এরপর ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার কাতারে আলোচনার আগে দুই পক্ষই পরবর্তী হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ‘সুফান সেন্টারের’ এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই হুমকি ও হামলাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি—বিশেষ করে ওমানের প্রতি—সম্ভবত একটি পরোক্ষ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যদি তারা ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা না করে তবে ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর গবেষণা প্রধান ইয়াসমিন ফারুক বলেন, এই হামলাগুলো ছাড়াও ‘উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে এমন এক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল যেখানে সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক নাও হতে পারে। তারা আলোচনার আঞ্চলিক পর্যায়ে নিজেরাই বিষয়গুলো নিজেদের হাতে তুলে নিতে যাচ্ছে।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে সৌদি আরব বৃহত্তর আলোচনার নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি, ব্যক্তিগত বৈঠকের আয়োজন করছে। আরেকটি গ্রুপে ইরাক অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যারা অর্থনৈতিকভাবে প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান হাতিয়ার হলো আর্থিক সক্ষমতা—অর্থাৎ ইরানের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা, যা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের প্রভাবে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে।
ইয়াসমিন ফারুক বলেন, তারা মনে করে যুদ্ধ শেষ হলে এটিই ইরানের দুর্বলতম জায়গা (অ্যাকিলিস হিল)। তবে তারা ইরানের কাছ থেকে ছাড় চাইবে যাতে সমুদ্রের ওপারে থাকা হুমকিগুলো কমানো যায়। এর অর্থ হতে পারে ইরানকে যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে তা সীমাবদ্ধ করা, অথবা শাসনব্যবস্থাটির প্রক্সি গ্রুপগুলোকে অস্ত্র সরবরাহের প্রচেষ্টা রোধ করা, যারা এই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরে অসংখ্য আলাদা বৈঠক—এবং তেহরান-ওয়াশিংটন বৃহত্তর আলোচনার পাশাপাশি—আঞ্চলিক দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রধান নির্ভরতা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
ইয়াসমিন ফারুক বলেন, আমেরিকা তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবেই থাকবে। দীর্ঘ সময় ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং অস্ত্র কেনাকাটার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। আমেরিকার কাছে যা নেই বা যা দ্রুত সংগ্রহ করা সম্ভব নয়—অথবা যদি ইরানি হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ব্যবস্থা না থাকে—তবে তারা তা অন্য কোথাও খুঁজবে।
বৈচিত্র্য আনার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। মে মাসে, কুয়েত তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য একটি প্রতিরক্ষা ক্রয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। ইউক্রেনও সম্প্রতি সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ড্রোন রপ্তানির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো আরও দূরে নজর দিচ্ছে; সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সাথে নতুন একটি ‘কোয়াড’ বা চারদেশীয় জোটে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমতে শুরু করেছে, বিশেষ করে ২০১৮ সালে যখন তিনি ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসেন, যার ফলে তেহরান ধীরে ধীরে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা মেনে চলা বন্ধ করে দেয়।
এরপর ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে, ইরানের সঙ্গে দুবার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে, ওয়াশিংটনের কাগজের প্রতিশ্রুতিগুলোরও হয়তো খুব একটা মূল্য নেই। তবে তারা সম্ভবত আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য এখনো পথ খুঁজবে, হতে পারে ট্রাম্পের ২০২৫ সালের সেই নির্বাহী আদেশের আদলে, যেখানে তিনি ‘কাতারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার’ কথা বলেছিলেন।
গোনুল তোল বলেন, তবুও, উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে ‘এমন ধারণা নিয়ে কাজ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে থাকবে না, এবং এমনকি যদি তারা সেখানে থাকেও, তবে তারা এমন কাজ করতে পারে যা তাদের ক্ষতি করবে।’
এবং বছরের পর বছর ধরে ইরানের প্রতি সমস্ত কূটনৈতিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও—যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের মতো একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের মাধ্যমে ইরানের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টিতে চোখ বন্ধ করে রাখা অন্তর্ভুক্ত—তারা লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই রয়ে যাবে।
একটি নতুন, আরও উগ্র ইরানি শাসনামলের ক্ষেত্রে এটি সম্ভবত আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, আগের শাসকরা হরমুজের নিয়ন্ত্রণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারলেও কখনোই তা বন্ধ করেনি।
এটি বিবেচনায় রেখে, উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সরাসরি অঞ্চল থেকে চলে যেতে বলবে না, যদিও তারা ভেঙে দেওয়া প্রতিশ্রুতির জন্য হতাশ।
তবে ইয়াসমিন ফারুক বলেন, তারা প্ল্যান বি এবং প্ল্যান সি তৈরি রেখে তাদের কৌশলগুলোকে পরিপূরক করে তুলবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা না করে।