অর্থনীতি

এনআরবি ব্যাংকে ‘কমিশন বাণিজ্য’, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩রা অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৬

এনআরবি ব্যাংকে ‘কমিশন বাণিজ্য’, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক


এনআরবি ব্যাংকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ৭৫ কোটি টাকার আমানত কেন্দ্র করে নিয়মবহির্ভূত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। 

জানা গেছে, প্রথমে সাধারণ ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে জমা নিয়ে পরে তা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে স্থানান্তর করা হয়, আর সেই সুযোগে এজেন্টকে আনুমানিক ২৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে। ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে গৃহীত আমানতে সাধারণত এজেন্ট কমিশন প্রাপ্য নয়। অভিযোগ অনুযয়ী, এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের প্রধান (জোনাল হেড) প্রশান্ত কুমার সিংহ, বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনেদ আহমেদ ও এজেন্ট সাদিকুর রহমান জড়িত। ব্যাংকের উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিঠির পর বিষয়টি তদন্তে নেমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকের এক নারী কর্মীও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন।

অভিযোগপত্র ও ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনায় জানা গেছে, বিএডিসির ৭৫ কোটি টাকার আমানতকে কেন্দ্র করে ওঠা এজেন্ট ব্যাংকিং কমিশন ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগে এনআরবি ব্যাংক পিএলসির সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রশান্ত কুমার সিংহ, ব্যাংকটির বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনেদ আহমেদ ও সিলেটের গোয়াইনঘাট তৌয়াকুল বাজারের এজেন্ট সাদিকুর রহমানের নাম এসেছে।  

ব্যাংকটির সিলেট শাখার একদল উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দুই দফা চিঠি দিয়েছেন। চিঠির অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকেও পাঠানো হয়েছে। প্রথম চিঠিটি চলতি বছরের ২০ জুলাই এবং দ্বিতীয়টি গত ৬ সেপ্টেম্বর দেওয়া হয়। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তে নেমেছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই বিষয়ে একটি তদন্ত টিম অভিযান চালিয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ১৭৩তম সভায় (এজেন্ডা নম্বর বি-১৭৩/০৪, স্মারক নম্বর বি-৫২২/২০২৩) এনআরবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এজেন্ট ব্যাংকিং এজেন্টদের জন্য একটি কমিশন কাঠামো অনুমোদন করে। এই নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব নিবন্ধিত এজেন্ট প্রকৃতপক্ষে এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করেন, তাঁরা নির্ধারিত কমিশন পাওয়ার অধিকারী। পর্ষদ-অনুমোদিত নীতিমালা এবং প্রযোজ্য আইন, বিধি ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে কমিশন দেওয়া হলে তা বৈধ। চিঠিদাতাদের ভাষ্য, তদন্তের মূল বিষয় কমিশন প্রদান নয়, কারণ পর্ষদ বৈধভাবে তা অনুমোদন করেছে। তাঁদের প্রশ্ন হলো, ওই ব্যবস্থা পরে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে সংগৃহীত হয়নি এমন একটি আমানতের বিপরীতে কমিশন সৃষ্টি ও প্রদান করা হয়েছে।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনেদ আহমেদের সঙ্গে বিএডিসির সিলেটের একজন প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। জুনেদ আহমেদের একাধিক অনুরোধ ও প্রচেষ্টার পর বিএডিসি সিলেটে এনআরবি ব্যাংকের শাখায় হিসাব খুলতে সম্মত হয়। এ বিষয়ে বিএডিসি গত বছরের ১৩ আগস্ট সিলেট শাখার ব্যবস্থাপককে হিসাব খোলার জন্য একটি চিঠি দেয় এবং পরে হিসাবটি খোলা হয়। হিসাব খোলার আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিএডিসি ৭৫ কোটি টাকার একটি চেক ইস্যু করে, যা গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেট শাখায় জমা হয়। হিসাব ও আমানতটি জুনেদ আহমেদের মাধ্যমে সংগৃহীত হওয়ায় ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে (সিবিএস) রিলেশনশিপ ম্যানেজারের (আরএম) কোডে তাঁর নামেই তা লিপিবদ্ধ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, পরে জোনাল হেড প্রশান্ত কুমার সিংহ গত বছরের ৪ ডিসেম্বর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদনের জন্য একটি সংশোধনী স্মারক উপস্থাপন করেন। তাতে বলা হয়, সিলেট শাখায় খোলা হিসাব ও সেখানে রাখা অর্থ ভুল কোডে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, যা সংশোধন করা প্রয়োজন। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আমানতটি প্রথমে ব্যাংকের প্রচলিত ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং সিবিএসে গৃহীত হয়েছিল, এজেন্ট ব্যাংকিং সিবিএসে নয়। দুটি ব্যবস্থা আলাদা হওয়ায় ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে গৃহীত আমানতের ক্ষেত্রে সাধারণত এজেন্ট কমিশন পাওয়ার কথা নয়। অথচ ২৬ নভেম্বর লেনদেনটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত বা স্থানান্তর করা হয়, যার ফলে পর্ষদ-অনুমোদিত কমিশন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। স্থানান্তরটি করা হয় সাদিকুর রহমানের এজেন্ট হিসাবের মাধ্যমে, যার নম্বর ৯৯৮২৯৯০০০০৩৩৫।

চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী সিলেট শাখা থেকে ওই এজেন্টকে কমিশন হিসেবে আনুমানিক ২৫ লাখ ৭১ হাজার ২৪৩ টাকা ৪৬ পয়সা ম্যানুয়ালি দেওয়া হয়েছে। পরে অতিরিক্ত কমিশনও দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রশান্ত কুমার সিংহ এই লেনদেন ও পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন এবং প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

তদন্তের ক্ষেত্র হিসেবে চিঠিতে পাঁচটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রথমত, আমানতটি প্রকৃতপক্ষে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং না এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে সংগৃহীত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং সিবিএসে বুকিংয়ের পর কেন এবং কী কারণে তা এজেন্ট ব্যাংকিং সিবিএসে স্থানান্তর বা পুনর্বুকিং করা হলো। তৃতীয়ত, এই পুনঃশ্রেণিবিন্যাস বৈধ করতে কেন পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সংশোধনী মেমো উপস্থাপন করা হয়েছিল। চতুর্থত, এজেন্টকে দেওয়া কমিশন প্রকৃত অর্থেই তাঁর সংগৃহীত ব্যবসার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে, নাকি কমিশনের অর্থ শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের কাছে গেছে। পঞ্চমত, পর্ষদ-অনুমোদিত কমিশন নীতিমালা এ ক্ষেত্রে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়েছে কি না।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের কাছে যেসব নথি পরীক্ষার অনুরোধ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিএডিসির হিসাব খোলা ও আমানত স্থাপনের পূর্ণাঙ্গ নথি, সিবিএসে আমানতটি প্রথম লিপিবদ্ধ হওয়ার লেনদেনধারা (ট্রানজ্যাকশন ট্রেইল), পরবর্তী স্থানান্তর বা পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের অডিট লগ ও তার অনুমোদনপ্রক্রিয়া, পরিচালনা পর্ষদ-অনুমোদিত কমিশন নীতিমালা ও এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদন, সংশোধনী মেমো ও সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক যোগাযোগ, কমিশন হিসাবায়নের নথি ও অর্থ পরিশোধের ভাউচার এবং এজেন্ট হিসাব নম্বরের পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক বিবরণী ও লেনদেনের ইতিহাস। কমিশনের অর্থ জমা হওয়ার পরপরই সংঘটিত নগদ উত্তোলন, অর্থস্থানান্তর বা অন্যান্য লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট সব ই-মেইল, দাপ্তরিক যোগাযোগ ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

চিঠিদাতারা বলেছেন, লেনদেনগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে, পর্ষদ-অনুমোদিত এজেন্ট ব্যাংকিং কমিশন ব্যবস্থা যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তে অনিয়ম বা অপরাধ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা ও পরিচয় নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

এ ছাড়া প্রশান্ত কুমার সিংহ, জুনেদ আহমেদ, সাদিকুর রহমান ও সিলেট শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবানবন্দি নেওয়ার জন্য চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

অন্যদিকে চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৭৩তম পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী, ৪ ডিসেম্বরের সংশোধনী মেমো এবং গত বছরের ১৩ আগস্ট বিএডিসির চিঠি সংযুক্ত করা হয়েছে। 

এদিকে ব্যাংকটির এমন কমিশন বাণিজ্যের ঘটনা এর আগেও ঘটেছিল বলে প্রতিবেদকের কাছে তথ্য এসেছে। ব্যাংকের সিলেটের এক নারী কর্মী কমিশন বাণিজ্য নিয়ে আগেই অভিযোগ করেছিলেন। নারী কর্মী জয়তী চক্রবর্তীর বাবা শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী গত বছরের জুনে এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি অভিযোগপত্র দেন। অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর মেয়েকে ব্রাঞ্চ সেলস এক্সিকিউটিভ পদে পুনর্বহালের আবেদন জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর মেয়ে ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল চৌহাট্টা শাখায় যোগ দেন এবং পরে পূর্ব শাহী ঈদগাহ শাখায় বদলি হন। তাঁর দাবি, জালালাবাদ গ্যাসের অর্থ এনআরবি ব্যাংকে জমা করানোর ক্ষেত্রে তাঁর মেয়ের ভূমিকা ছিল এবং তা ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জেনেও তাকে যথাযথ স্বীকৃতি স্বরূপ কমিশন দেওয়া হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতেও প্রশান্ত কুমার সিংহের নাম রয়েছে। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশান্ত কুমার সিংহকে অনেকবার ফোন করা হয় এবং তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে এসএমএস করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ব্যাংকটির বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনেদ আহমেদও এসব বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না বলে জানান।

এদিকে সিলেট শাখার একাধিক কর্মকর্তার জানান, প্রশান্ত দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কমিশনভিত্তিক আমানত ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এ ধরনের কমিশন ব্যবসার অন্যতম সুবিধাভোগী। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ, OBE-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায়, এ বিষয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাছে কথা বলতে বা বিষয়টি উত্থাপন করতে কেউ সাহস করেননি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও তদন্তের মাধ্যমে এখন প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।